আগামীকাল আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। সবার মুখে এখন প্রশ্ন, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নারী প্রেসিডেন্ট পাবে আমেরিকা নাকি দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় বসবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। যদিও শুরু থেকে সব জনমত জরিপ গেছে কমলার পক্ষে। তবে ট্রাম্পও রয়েছে শক্ত অবস্থানে।
এবার শেষ মুহূর্তে অপ্রত্যাশিত সুখবর পেলেন ডেমোক্র্যাট কমলা হ্যারিস। রিপাবলিকান ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত আইওয়া অঙ্গরাজ্যে করা জরিপে এগিয়ে তিনি। ভোটের প্রাক্কালে প্রকাশিত মইনেস রেজিস্টার ও মিডিয়াকমের চূড়ান্ত জরিপে দেখা গেছে রাজ্যটির ৪৭ শতাংশ মানুষ এবার কমলাকে চায়।
রয়টার্স জানিয়েছে, গত ২৮ থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত পরিচালিত এই জরিপে অংশ নেন ৮০৮ জন ভোটার। প্রকাশিত ফলে দেখা যায়, এতে অংশগ্রহণকারীদের ৪৭ শতাংশ কমলা হ্যারিস ও ৪৪ শতাংশ ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি তাদের সমর্থনের কথা জানিয়েছেন।
এর আগে গত সেপ্টেম্বরের জরিপে অঞ্চলটিতে ৪ পয়েন্ট এগিয়ে ছিলেন ট্রাম্প। শুধু তা-ই নয়, ২০১৬ ও ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও এই অঙ্গরাজ্যে জয়ী হন তিনি। ওই দুই ভোটে যথাক্রমে ৯ ও ৮ পয়েন্টের ব্যবধানে বিজয়ী হন ট্রাম্প।
তবে সর্বশেষ জরিপে সাবেক প্রেসিডেন্টকে পেছনে ফেলে কমলার এগিয়ে যাওয়ার নেপথ্যে নারী ভোটারদের বড় ভূমিকা ছিল। বিশেষ করে বয়স্ক ও রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ নারীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থীর প্রতি তাদের সমর্থনের কথা জানিয়েছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পদ্ধতি
প্রার্থীদের যোগ্যতা : মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হতে সংবিধান অনুযায়ী প্রার্থীকে জন্মসূত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হতে হবে। বয়স হতে হবে অন্তত ৩৫ বছর। ১৪ বছর যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করতে হবে। ইলিনয় স্টেটের ডেপল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ওয়েন স্টেগার ডয়েচে ভেলেকে বলেছেন, প্রাপ্তবয়স্ক প্রায় যে কোনো নাগরিক প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হতে পারেন।
প্রাইমারি ও ককাসের মাধ্যমে প্রার্থী নির্বাচন : নির্বাচনে লড়াইয়ের ময়দান উন্মুক্ত থাকলেও প্রাইমারি ও ককাসের মাধ্যমে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রার্থীর সংখ্যা কমিয়ে আনা হয়। এই দুই পদ্ধতির মাধ্যমে দলগুলো তাদের প্রার্থী বাছাই করে। নির্বাচনি বছরের শুরুর দিকে রাজ্য পর্যায়ে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। প্রাইমারিতে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে দলের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ককাস প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাজ্যগুলোতে রাজনৈতিক দলের সদস্যরা ভোটাভুটির মাধ্যমে নিজেদের প্রার্থী বাছাই করেন।
জাতীয় কনভেনশনের ভূমিকা : রাজ্য পর্যায়ে প্রাইমারি ও ককাস শেষ হলে রাজনৈতিক দলগুলো জাতীয় কনভেনশনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ও তার রানিংমেট বা ভাইস-প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী বাছাই করেন। কনভেনশনে যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি রাজ্য থেকে আগত ডেলিগেটেরা প্রেসিডেন্ট প্রার্থী বাছাইয়ে ভোট দেন। একজন প্রার্থীকে মনোনয়ন পেতে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পেতে হয়।
ইলেকটোরাল কলেজ : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট দেশটির নাগরিকদের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হন না। ‘ইলেকটোরাল কলেজ’ নামে পরিচিত একদল কর্মকর্তার পরোক্ষ ভোটেই নির্বাচিত হন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। কলেজ শব্দটির অর্থ এখানে সেই ব্যক্তিদের বোঝানো হয় যারা একটি অঙ্গরাজ্যের ভোট দেওয়ার অধিকারী। ইলেকটোরাল কলেজ হচ্ছে কর্মকর্তাদের একটি প্যানেল যাদের ইলেক্টরস বলা হয়। এরা এক কথায় নির্বাচক মণ্ডলী। প্রতি চার বছর পর পর এটি গঠন করা হয় এবং এরাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট এবং ভাইস প্রেসিডেন্টকে বাছাই করেন। কংগ্রেসে প্রতিনিধিত্বের অনুপাতে প্রতিটি স্টেটের ইলেক্টরসের সংখ্যা নির্ধারিত হয়। যা নির্ধারিত হয় স্টেটে সিনেটরের সংখ্যা (প্রত্যেক স্টেটে দুইজন) এবং প্রতিনিধি পরিষদে প্রতিনিধির (যা জনসংখ্যার অনুপাতে) যোগফল মিলে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ইলেকটোরাল কলেজের মোট আসন সংখ্যা ৫৩৮টি। এই নির্বাচনে বিজয়ী হতে হলে কমপক্ষে ২৭০টি ইলেকটোরাল ভোট পেতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যের একটিতে জয়ী হওয়ার অর্থ একজন প্রার্থী সেই অঙ্গরাজ্যের সবকটি ‘ইলেকটোরাল কলেজ’ ভোট পেয়ে যাবেন।
যেভাবে ইলেকটোরাল কলেজ কাজ করে : একজন প্রার্থী সারা দেশে হয়তো কম ভোট পেয়েছেন, কিন্তু বেশ কতগুলো কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতে গিয়ে একজন প্রেসিডেন্ট হয়ে যেতে পারেন। ধরা যাক, টেক্সাসে একজন প্রার্থী ভোটারদের সরাসরি ভোটের ৫০.১ শতাংশ পেয়েছেন, তাকে ওই অঙ্গরাজ্যের হাতে থাকা ৪০টি ইলেকটোরাল ভোটের সবগুলোই সেই প্রার্থী পেয়ে যাবেন। একটি অঙ্গরাজ্যে জয়ের ব্যবধান যদি বিরাট হয়ও তারপরেও জয়ী প্রার্থী সবগুলো ইলেকটোরাল ভোটই পাবেন।
ইলেকটোরাল ভোটে ‘টাই’ হলে যা হবে : কোনো ক্ষেত্রে যদি স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা কেউ না পান, সেক্ষেত্রে মার্কিন আইনসভার নিম্ন-কক্ষ হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভস ভোট দিয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করবে। এই ঘটনা মাত্র একবারই হয়েছে ১৮২৪ সালে।
‘সুইং স্টেট’ এবং নির্বাচনে এগুলোর প্রভাব : বেশিরভাগ অঙ্গরাজ্যই প্রতিটা নির্বাচনে ধারাবাহিকভাবে একই দলকে ভোট দিয়ে আসে। রিপাবলিকান দুর্গ বলে পরিচিত রাজ্যগুলো ‘রেড স্টেট’ এবং ডেমোক্রেটপ্রধান রাজ্যগুলো ‘ব্লক স্টেট’ হিসাবে পরিচিত। এসব রাজ্য নিয়ে প্রার্থীদের চিন্তা করতে হয় না। কিন্তু হাতেগোনা কিছু অঙ্গরাজ্য আছে, যে রাজ্যগুলোর ভোট যে কোনো শিবিরে যেতে পারে। এসব রাজ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়। এজন্য এসব রাজ্যকে ‘সুইং স্টেট’ বা ‘ব্যাটলগ্রাউন্ড স্টেট’ বলা হয়।
এগুলোই হল যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনি রণক্ষেত্র। এসব রাজ্যে ভোট কোন পার্টির পক্ষে যাবে তা নির্দিষ্ট করে বোঝা যায় না। তাই প্রার্থীদের কাছে এসব অঙ্গরাজ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।